সাইয়েদ কুতুব (১৯০৬-১৯৬৬) আধুনিক ইসলামী চিন্তাধারার একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর জীবন, লেখনী এবং আদর্শের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। মিশরে জন্মগ্রহণকারী এই মহান চিন্তাবিদ, লেখক এবং ইসলামী আন্দোলনের নেতা পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর অবিচল অবস্থান এবং ইসলামী সমাজব্যবস্থার পক্ষে সোচ্চার প্রচারণার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আল্লাহর পথে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন, এমনকি ফাঁসির মঞ্চেও তিনি নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
এই প্রবন্ধে আমরা সাইয়েদ কুতুবের জীবনী, পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তাঁর বিস্তৃত অবস্থান এবং মুসলিমদের জন্য তাঁর কিছু আদর্শ উক্তি নিয়ে আলোচনা করব।
জীবনী: সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
সাইয়েদ কুতুব ১৯০৬ সালের ৯ অক্টোবর মিশরের আসয়ুত জেলার মুশা গ্রামে একটি ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হাজী ইব্রাহিম কুতুব ছিলেন একজন কৃষক, এবং মা ফাতিমা হোসাইন উসমান ছিলেন গভীর ইসলামী চেতনার অধিকারী। শৈশবেই তিনি মায়ের ইচ্ছায় কুরআন হিফজ করেন, যা তাঁর জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়। পরবর্তীতে তিনি কায়রোর দারুল উলুম মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৩৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রাথমিক জীবনে তিনি শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৪৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁকে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি অধ্যয়নের জন্য আমেরিকায় পাঠায়। সেখানে দুই বছর অবস্থানকালে তিনি পশ্চিমা সমাজের ভোগবাদী জীবনধারা ও বস্তুবাদী দর্শনের সাথে পরিচিত হন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে একটি বড় মোড় ঘটায়। আমেরিকা থেকে ফিরে তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমিন (মুসলিম ব্রাদারহুড)-এ যোগ দেন এবং ১৯৫৩ সালে দলের তথ্য ও প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। তিনি দলের মুখপত্র "ইখওয়ানুল মুসলিমিন" পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি জামাল আবদেল নাসেরের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ১৯৫৪ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং দীর্ঘ ১০ বছর কারাগারে কাটান। কারাগারে থাকাকালীন তিনি তাঁর বিখ্যাত তাফসীর "ফী যিলালিল কুরআন" এবং "মাআলিম ফিত তারিক" (আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র) রচনা করেন। ১৯৬৪ সালে মুক্তি পেলেও ১৯৬৫ সালে পুনরায় গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৬ সালের ২৯ আগস্ট ফাঁসির মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সাইয়েদ কুতুবের অবস্থান
সাইয়েদ কুতুব পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র সমালোচনা ও দৃঢ় অবস্থানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, পশ্চিমা সমাজ বস্তুবাদ, ভোগবাদ এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা মানবতার জন্য ধ্বংসাত্মক। আমেরিকায় তাঁর অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করে। তিনি দেখেছিলেন যে, পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে প্রবৃত্তির দাসত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিবর্তে অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য গড়ে উঠেছে।
১. বস্তবাদির সমালোচনা: সাইয়েদ কুতুব তাঁর লেখায় বারবার উল্লেখ করেছেন যে, পশ্চিমা সভ্যতা মানুষকে আধ্যাত্মিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বস্তুগত সুখের পেছনে ছুটতে বাধ্য করেছে। তিনি লিখেছেন, "পশ্চিমা সমাজে মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোগ-বিলাস এবং প্রবৃত্তির তৃপ্তি। এটি মানবতাকে একটি অন্ধকার গহ্বরে নিয়ে গেছে।" তাঁর মতে, এই বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং জীবনকে অর্থহীন করে তোলে।
২. জাহিলিয়্যাহর ধারণা: সাইয়েদ কুতুব পশ্চিমা সমাজকে "আধুনিক জাহিলিয়্যাহ" (অজ্ঞতার যুগ) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, "যে সমাজ আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানুষের তৈরি আইন মেনে চলে, সে সমাজ জাহিলিয়্যাহর মধ্যে বাস করে।" তাঁর মতে, পশ্চিমা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ—এগুলো সবই মানুষের তৈরি ব্যবস্থা, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে। তিনি এই ধারণার বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা তাঁর বিপ্লবী চিন্তার মূল ভিত্তি ছিল।
৩. সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা: পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম বিশ্বের ওপর যে শোষণ ও আধিপত্য চাপিয়েছে, তা সাইয়েদ কুতুবের কাছে ছিল অগ্রহণযোগ্য। তিনি দেখেছিলেন, ব্রিটিশ ও আমেরিকান শক্তি মিশরসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে তাদের প্রভাব বিস্তার করে ইসলামী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে। তিনি এই সাম্রাজ্যবাদকে ইসলামের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং এর বিরুদ্ধে সংগ্রামকে মুসলিমদের ওপর ফরজ বলে ঘোষণা করেন।
৪. ইসলামী সমাজের প্রতিষ্ঠা: পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে তিনি একটি খাঁটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন, যেখানে শরিয়াহই হবে একমাত্র আইন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, পশ্চিমা সভ্যতা মানুষের জন্য কল্যাণ আনতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং একমাত্র ইসলামই পারে মানবতাকে শান্তি ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে। তাঁর "মাআলিম ফিত তারিক" গ্রন্থে তিনি এই ধারণাকে বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর এই অবস্থান তাঁকে পশ্চিমা শক্তি ও তাদের সমর্থক স্থানীয় শাসকদের কাছে বিপজ্জনক করে তোলে। তাঁর লেখনী ও আন্দোলন মিশরের নাসের সরকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, যারা পশ্চিমাদের সাথে সমঝোতার পথে ছিল। ফলস্বরূপ, তাঁকে নির্মম নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়।
মুসলিমদের জন্য আদর্শ উক্তি
সাইয়েদ কুতুবের লেখনী ও বক্তব্যে এমন অনেক উক্তি রয়েছে, যা মুসলিমদের জন্য প্রেরণা ও পথনির্দেশক। এখানে তাঁর কিছু বিখ্যাত উক্তি তুলে ধরা হলো:
১. "যদি আমাকে ন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া হয়, তবে আমি তাতে সন্তুষ্ট। আর যদি অন্যায়ভাবে বন্দি করা হয়, তবে আমি জালিমের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার মতো নীচ নই।"
এই উক্তিটি তিনি কারাগারে থাকাকালীন বলেছিলেন, যখন তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এটি তাঁর অটল ঈমান ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক।
২. "ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে আল্লাহর দাসত্বের মাধ্যমে সত্যিকারের স্বাধীনতা দেয়।"
এই কথায় তিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব এবং পশ্চিমা স্বাধীনতার মিথ্যা ধারণার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন।
৩. "যে সমাজ আল্লাহর আইন মানে না, সে সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।"
এটি তাঁর জাহিলিয়্যাহর ধারণার সারাংশ, যা মুসলিমদের শরিয়াহভিত্তিক জীবনের প্রতি আহ্বান জানায়।
৪. "আমার কালিমা আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছে, আর তোমার কালিমা তোমার রুটি যোগায়।"
ফাঁসির আগে একজন সরকারি মৌলভীর প্রতি বলা এই কথা তাঁর আদর্শের প্রতি অবিচলতা ও শাহাদাতের জন্য প্রস্তুতির প্রমাণ।
৫. "একমাত্র ইসলামী সমাজই মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে, যেখানে কালো-সাদা, আরব-অনারব সবাই সমান।"
এই উক্তিতে তিনি ইসলামের সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যা পশ্চিমা বর্ণবাদ ও শ্রেণিবৈষম্যের বিপরীত।
সাইয়েদ কুতুবের জীবন এবং আদর্শ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর লেখনী, চিন্তা এবং সংগ্রাম শুধুমাত্র পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে এক দৃঢ় প্রতিরোধ ছিল না, বরং ইসলামী মূল্যবোধ এবং শরিয়া ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে একটি বিপ্লবী আহ্বান ছিল। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখি, সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং আল্লাহর সেবা ও আদর্শকে অনুসরণ করা কখনোই পরাজিত হবেনা।
তিনি যে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন, যেখানে মানবতা, ন্যায়, সমতা এবং ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, তা আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের মুসলিম উম্মাহর জন্য সাইয়েদ কুতুবের কথা যেন একটি সতর্কবার্তা, যে আমরা যদি ইসলামি মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে পশ্চিমা ভাবধারা বা আধুনিকতার নামে অন্যথা গ্রহণ করি, তবে আমরা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাব। তাঁর জীবন, তাঁর মৃত্যু, এবং তাঁর লেখনী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে সত্যের পথে চলা সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানবতার কল্যাণের দিকে নিয়ে যাবে।
সাইয়েদ কুতুবের আদর্শ আমাদের প্রত্যেককে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে এবং ইসলামী সমাজের প্রতিষ্ঠা জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর সাহসিকতা, আত্মত্যাগ এবং নির্ভীকতার মধ্যে নিহিত রয়েছে এক মহান শিক্ষা, যা আজও মুসলিম সমাজের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে আছে। তাঁর জীবন আমাদেরকে জানিয়ে দেয়, যে কোনো চাপ বা ত্রুটি যতই আসুক, আল্লাহর পথে চলতে থাকা কখনোই পরাজয় নয়; বরং, একমাত্র সেই পথেই রয়েছে মুক্তি এবং প্রকৃত বিজয়।