কেন এবং কে আমাদের মুসলিম নেতাদের হত্যা করেছে?

কেন এবং কে আমাদের মুসলিম নেতাদের হত্যা করেছে? পশ্চিমা শক্তির ষড়যন্ত্র এবং মুসলিম নেতাদের মৃত্যুর পেছনে থাকা কারণ ও সুবিধাভোগী শক্তি।

 বিশ্ব ইতিহাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা অপরিচিত নয়। তবে, গত ৮০ বছরে (১৯৪৫-২০২৫) মুসলিম বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী নেতা এমন পরিণতির শিকার হয়েছেন, যেখানে বিদেশি ষড়যন্ত্র, বিশেষ করে পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানই তাদের জীবনের মূল্য দিতে হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা দেখব, কীভাবে এই নেতারা পশ্চিমা শক্তির আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শহীদ হয়েছেন।


১. হাসান আল-বান্না (১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৯)
মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল-বান্না ইসলামি জাগরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা পশ্চিমা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ছিল। ১৯৪৯ সালে কায়রোতে তাকে গুপ্তঘাতকরা হত্যা করে। পশ্চিমা সমর্থিত মিশরীয় সরকার তার ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ভয় পেয়েছিল, এবং এই হত্যার পেছনে তাদের পরোক্ষ হাত ছিল বলে মনে করা হয়।

২. সাইয়েদ কুতুব (২৯ আগস্ট, ১৯৬৬)
সাইয়েদ কুতুব তার লেখনীর মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৬৬ সালে, আমেরিকার সমর্থিত নাসের সরকার তাকে ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসি দেয়। তার মৃত্যু পশ্চিমা শক্তির জন্য একটি বার্তা ছিল যে, ইসলামি চিন্তা দমন করা হবে।

৩. আবদিরাশিদ আলী শর্মার্কে (১৫ অক্টোবর, ১৯৬৯)
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদিরাশিদ শর্মার্কে পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন সোমালিয়া গড়তে চেয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে তার নিজের দেহরক্ষীর হাতে হত্যার পেছনে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার পরোক্ষ ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায়, যা পরবর্তীতে দেশটিতে অস্থিরতা ছড়ায়।

৪. শেখ মুজিবুর রহমান (১৫ আগস্ট, ১৯৭৫)
বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিব পাকিস্তানের মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তির প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়ে একটি স্বাধীন দেশ গড়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে তাকে সামরিক অভ্যুত্থানে হত্যা করা হয়, যার পেছনে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠীর হাত ছিল বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।

৫. বাদশাহ ফয়সাল (২৫ মার্চ, ১৯৭৫)
সৌদি আরবের রাজা ফয়সাল তেল সম্পদের ওপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে তার ভাইপোর হাতে হত্যার পেছনে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে, কারণ তার নীতি আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েছিল।

৬. ইব্রাহিম আল-হামদি (১১ অক্টোবর, ১৯৭৭)
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম আল-হামদি পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন ইয়েমেন চেয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তাকে গুপ্তহত্যায় হত্যা করা হয়, যার পেছনে পশ্চিমা সমর্থিত প্রতিবেশী দেশগুলোর হাত ছিল বলে ধারণা করা হয়।

৭. জুলফিকার আলী ভুট্টো (৪ এপ্রিল, ১৯৭৯)
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো পারমাণবিক শক্তি অর্জনের মাধ্যমে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ১৯৭৯ সালে আমেরিকার সমর্থিত জিয়াউল হক তাকে ফাঁসি দেয়, যা পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষার একটি উদাহরণ।

৮. আনোয়ার সাদাত (৬ অক্টোবর, ১৯৮১)
আনোয়ার সাদাত ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সমঝোতা করলেও, তার প্রাথমিক জাতীয়তাবাদী নীতি আমেরিকাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ১৯৮১ সালে জঙ্গিদের হাতে তার হত্যা পশ্চিমা পরিকল্পনার অংশ ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

৯. জিয়াউর রহমান (৩০ মে, ১৯৮১)
বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পশ্চিমা নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে তাকে সামরিক অভ্যুত্থানে হত্যা করা হয়, যার পেছনে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের পরোক্ষ সমর্থন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

১০. মোহাম্মদ জিয়া উল হক (১৭ আগস্ট, ১৯৮৮)
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়া উল হক সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে পশ্চিমের সঙ্গে কাজ করলেও, তার ইসলামি নীতি আমেরিকার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। ১৯৮৮ সালে তার বিমান বিস্ফোরণে পশ্চিমা হাতের সন্দেহ রয়েছে।

১১. শেখ আহমেদ ইয়াসিন (২২ মার্চ, ২০০৪)
হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ২০০৪ সালে আমেরিকার সমর্থিত ইসরায়েলি হামলায় তিনি শহীদ হন।

১২. আব্দেল আজিজ আল-রানতিসি (১৭ এপ্রিল, ২০০৪)
ইয়াসিনের পর হামাসের নেতা আল-রানতিসিও পশ্চিমা-ইসরায়েলি ষড়যন্ত্রের শিকার হন। ২০০৪ সালে তাকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হত্যা করা হয়।

১৩. রফিক হারিরি (১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৫)
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি সিরিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০০৫ সালে গাড়ি বোমা হামলায় তার মৃত্যুতে আমেরিকার পরোক্ষ হাত ছিল বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।

১৪. সাদ্দাম হুসেইন (৩০ ডিসেম্বর, ২০০৬)
ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইন পশ্চিমা তেল স্বার্থের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ২০০৬ সালে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

১৫. বেনজির ভুট্টো (২৭ ডিসেম্বর, ২০০৭)
বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন। ২০০৭ সালে সন্ত্রাসী হামলায় তার মৃত্যুতে পশ্চিমা সমর্থিত গোষ্ঠীর হাত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৬. মুয়াম্মার গাদ্দাফি (২০ অক্টোবর, ২০১১)
লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফি পশ্চিমা তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০১১ সালে ন্যাটোর সমর্থনে বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে, যা পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের প্রমাণ।

১৭. আবদুল কাদের মোল্লা (১২ ডিসেম্বর, ২০১৩)
জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লা ইসলামি আদর্শের জন্য লড়েছিলেন। ২০১৩ সালে পশ্চিমা চাপে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

১৮. মোহাম্মদ মুরসি (১৭ জুন, ২০১৯)
মিশরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি পশ্চিমা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের শিকার হন। ২০১৯ সালে কারাগারে তার মৃত্যু পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের ফল বলে মনে করা হয়।

১৯. কাসেম সোলেইমানি (৩ জানুয়ারি, ২০২০)
ইরানের জেনারেল সোলেইমানি পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ২০২০ সালে আমেরিকার ড্রোন হামলায় তিনি শহীদ হন।

২০. ইব্রাহিম রাইসি (১৯ মে, ২০২৪)
ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০২৪ সালে তার হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় পশ্চিমা হাতের সন্দেহ রয়েছে।

২১. ইসমাইল হানিয়া (৩১ জুলাই, ২০২৪)
হামাসের নেতা হানিয়া ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ২০২৪ সালে ইরানে ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন।

বিশ্বের মুসলিম নেতাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা শক্তির ষড়যন্ত্রের ইতিহাস দীর্ঘ এবং জটিল। এসব নেতারা, যারা ইসলামী মূল্যবোধ, স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্থের পক্ষে সংগ্রাম করেছেন, তাদের জীবন শঙ্কার মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই পশ্চিমা আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাদের নীতি কখনোই পশ্চিমের স্বার্থের সাথে মেলে না। এ কারণে তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে, বন্দী করা হয়েছে বা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এই নেতাদের মৃত্যু বা হত্যা শুধু তাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ছিল না, বরং এটি মুসলিম বিশ্বের সংগ্রামের এক কঠিন অধ্যায়ের চিহ্ন। তাদের প্রতিটি মৃত্যু, বিশেষ করে যখন তা বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে আসে, মুসলিম দেশগুলির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য একটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। তবে, এই সব ঘটনার পেছনে এক বিষ্ময়কর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—পশ্চিমা শক্তি কোন অবস্থাতেই তাদের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করার মুসলিম নেতাদের সহ্য করতে পারে না।

এগুলো কি শুধুই একাধিক কাকতালীয় ঘটনা, নাকি এটি একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পিত কৌশল যা বহু বছর ধরে চলেছে? প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যে কোনো মুসলিম নেতাকে এই পথে যেতে হবে—এটা কি ইতিহাসের একটি অবধারিত চক্র? এর উত্তর শুধু সময়ই দিতে পারবে, তবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এসব নেতা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনে শহীদ হননি, তারা একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন।

আজকের দিনে, মুসলিম বিশ্বের মধ্যে যে স্বাধীনতা এবং আত্মনির্ভরতার আন্দোলন চলছে, তা ঐসব শহীদ নেতাদের চেতনা থেকেই উৎসাহিত। তাদের আদর্শ, কণ্ঠস্বর এবং সংগ্রাম আজও অনেক মুসলিম দেশকে উদ্বুদ্ধ করে এবং পশ্চিমা শক্তির আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে নতুন নতুন সংগ্রাম গড়ে তুলতে সহায়ক হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন থাকে—এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে কি না? কি এমন পরিবর্তন আসবে, যা এই দীর্ঘকালীন শোষণ ও ষড়যন্ত্রের চক্রকে ভেঙে দিতে সক্ষম হবে? মুসলিম বিশ্বের জন্য এটি একটি গুরুতর এবং অমীমাংসিত প্রশ্ন, যার উত্তর কেবল জনগণের ঐক্য এবং দৃঢ়প্রত্যয়ী নেতৃত্বের মধ্যে নিহিত থাকতে পারে।

পশ্চিমা শক্তির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম কি কখনো থামবে? মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতার জন্য কেবলমাত্র ঐতিহাসিক চেতনা আর সংগ্রামের পথেই কি সত্যিকারের মুক্তির আশা আছে? সময়ের সাথে সাথে আমাদেরই সে পথে এগিয়ে যেতে হবে।

Labels : #Islam ,#Mystery ,#politics ,

Post a Comment