নিরপরাধ জানাবি: যুদ্ধের বলি এক কিশোরীর করুণ গল্প

ইরাক যুদ্ধের নৃশংসতার শিকার ১৪ বছরের জানাবি। মার্কিন সেনাদের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার এই কিশোরীর গল্প মানবতার কালো অধ্যায়।

 ১২ মার্চ ২০০৬। ইরাকের ইউসুফিয়া গ্রামের এক শান্ত সকাল। জানাবি পরিবার তাদের প্রতিদিনের কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিল। বাবা ক্বাসিম হামযা রহিম দুই ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, মা ফখরিয়া ত্বহা মুহসিন সকালের নাস্তা বানাচ্ছিলেন, আর ১৪ বছর বয়সী মেয়ে আবির আল জানাবি ঘরের কাজে সাহায্য করছিল। জানাবি পরিবার জানত না, এদিনই তাদের জীবনের শেষ দিন।

Image Source: Geneva International Centre for Justice
আবির ক্বাসিম আল-জানাবি (১৯৯১ – ২০০৬) ছিলেন ১৪ বছর বয়সী এক ইরাকি কিশোরী, যাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং তার পরিবারকেও ১২ মার্চ ২০০৬ সালে মার্কিন সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে।

জানাবিদের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরেই ছিল মার্কিন সেনাদের একটি নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকি। ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনারা বিভিন্ন এলাকায় এমন চৌকি স্থাপন করেছিল। এই চৌকিতে থাকা কয়েকজন মার্কিন সেনার নজরে পড়ে জানাবি। ধীরে ধীরে তারা পরিকল্পনা করে কিশোরী জানাবিকে নিজেদের হিংস্র লালসার শিকার বানানোর।

সেদিন দুপুরে, স্টিভেন গ্রিন, পল কর্টেজ, জেমস বার্কার এবং স্পেইলম্যান নামে চার মার্কিন সেনা অ্যালকোহল পান করে জানাবিদের বাড়িতে হামলা চালায়। প্রথমেই তারা ক্বাসিম এবং তার ৬ বছর বয়সী মেয়ে হাদিলকে আলাদা করে ঘরের এক কোণে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এরপর জানাবির মাকেও মেরে ফেলে তারা।

জানাবি একা পড়ে যায়। শিকারি হায়েনার দল তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। অসহায় কিশোরী আত্মরক্ষা করার ব্যর্থ চেষ্টা করে, কিন্তু পাষণ্ডদের হাত থেকে রক্ষা পায় না। এক পর্যায়ে স্টিভেন গ্রিন বন্দুক তুলে জানাবির মাথায় গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় সে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। হত্যাকারীরা প্রমাণ লোপাটের জন্য মৃতদেহগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর তারা ফিরে যায় চেকপয়েন্টে, যেন কিছুই হয়নি। এমনকি এই পাশবিকতার পর তারা ‘চিকেন উইংস’ পার্টি দিয়ে আনন্দ উদযাপন করে।

তবে সত্য চিরকাল চাপা থাকে না। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে জানাবির পরিবারের হত্যার পেছনের নৃশংস সত্য। মার্কিন সেনাদের নিজেদের আদালতেই শুরু হয় বিচার। স্টিভেন গ্রিনসহ অভিযুক্তরা বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পায়। গ্রিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, কিন্তু ২০১৪ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করে সে।

যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা জানাবির মতো হাজারো নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। জানাবির স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে একদিন বড় কিছু হওয়ার। কিন্তু যুদ্ধ তার স্বপ্ন, তার জীবন সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছে। তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হয় নিরীহ সাধারণ মানুষ।

Labels : #History ,#politics ,

Post a Comment